কম্পিউটারের ডেস্কে বসে বসে তনয় ভাবছিলো, ঝগড়ার কি কোনো নির্দিষ্ট ওজন থাকে?
যদি থাকতো, তবে এই মুহূর্তে তাদের বেডরুমের
বাতাসটার ওজন অন্তত কয়েক টন হতো। ভারী, স্তব্ধ
এবং দমবন্ধ করা এক নীরবতা। মিটু ও মিঠাই ও ময়নার কিচির মিচির শব্দ এ ঘরে স্পষ্ট শোনা
যাচ্ছে। অথচ তার ঠিক পাশের রমে শুয়ে আছে পৃথা, যার নিঃশ্বাসের শব্দও এখন তনয়ের কাছে
অচেনা মনে হচ্ছে। ঝগড়াটার সূত্রপাত কিন্তু কোনো মহাকাব্যিক কারণে হয়নি। কারনটা ছিল
এক কাপ চা বানিয়ে না দেওয়া। রান্নাঘরের নীরব যুদ্ধ। শনিবারের সকালটা আর অন্য সকল দিনের
মতোই শুরু হয়েছিল। তনয় সেদিন রাত্রীবেলার ডিউটি শেষ করে বাসায় আসলো। পৃথাকে বলে নাস্তা
সেরে নিলো। কম্পিউটারে তার একটা প্রজেক্টের এপ্রুভাল হয়েছে কিনা তার ইমেইল চেক করতে
করতে সে বিষন্ন হয়ে, মিঠু মিটাই ও ময়না নিয়ে ব্যস্ত পৃথার দিকে তাকিয়ে একটু জোরেই বলল,
"পৃথা, এক কাপ কড়া করে চা দাও না প্লিজ! মাথাটা কেমন যেন ধরে আছে।" পৃথা
তখনও তার পোষা পাখিদ্বয় মিটু মিঠাই ও ময়নাকে খাওয়াচ্ছিল। সপ্তাহের সাত দিন সংসারের
কাজ ও তার পোষা পাখিদ্বয়ের যত্নের চাপে নিজের ঘরটা গুছিয়ে নেওয়ার সময় পায় না সে। তনয়ের
গলার সুর শুনে সে বলল,
"তনয়, আমি একটু ব্যস্ত আছি। তুমি নিজেই
একটু চা বানিয়ে নাও না আজ?"
তনয় কম্পিউটারের ডেস্ক থেকে মুখ না তুলেই
বলল, "আরে, আমি একটা জরুরি মেইল চেল করে হতাশ হয়ে আছি। তুমি তো জানো, সকালে এক
কাপ চা না পেলে আমার কোন কাজ করতে মন বসে না। মিটু মিঠাই ও ময়নাদের তো পরে খাওয়ালেও
হতো।"
পৃথা এবার রাগের মাথায় রান্নাঘরে চলে এলো।
তার মুখ থমথমে। "তুমি তো সারাজীবন নিজের কাজটাকেই জরুরি ভাবলে তনয়! আমাকে একটু
ছাড় দিবে তা না, উল্টো হুকুম করছো। আমি কি তোমার কেনা গোলাম যে আমার কোনো কাজ থাকতে
নেই?
হুকুম কোথায় করলাম? জাস্ট এক কাপ চা-ই তো
চেয়েছি!"
তনয়ের কণ্ঠেও এবার বিরক্তি। "ডিউটি থেকে
আসলাম চা চাওয়াটা কি অপরাধ?
পৃথা বলল অপরাধ না, কিন্তু যখন দেখছ আমি ব্যস্ত,
তখন নিজে এক কাপ চা বানিয়ে আমাকেও এক কাপ খাওয়ানোটা তোমার ভদ্রতা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু
তুমি তো তা করবে না।
"ব্যস, লাইটারের এক তুড়িতে চুলা জ্বলে
উঠলো। এরপর চা না বানানোর অলসতা থেকে কথা চলে গেল তনয়ের ভুল গুলোর দিকে। সেখান থেকে
গেলো তনয়ের দেরিতে বাড়িতে ঢোকা প্রসঙ্গে, আর সবশেষে এসে ঠেকল—"তুমি আমাকে একটুও
বোঝো না" নামক চিরন্তন ট্র্যাজেডিতে। দুজনেই যে যার মতো মুখভার করে দু-দিকে চলে
গেল। দুপুরের খাবার খাওয়া হলো রোবটের মতো যান্ত্রিকভাবে। কোনো কথা হলো না। এর পরে তনয়ের
ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে দুজনেই হেসে উঠল। ঘরের ভেতরের সেই ভারী নীরবতাটা কর্পূরের মতো
উবে গেল। তারা বুঝতে পারল, দাম্পত্য মানে কোনো নিখুঁত রূপকথা নয়। দাম্পত্য মানে হলো—দুটো
ভিন্ন মানুষের একে অপরের খামতিগুলোকে মেনে নিয়ে, ছোটখাটো ঝগড়াগুলোকে ভালোবাসার চাদরে
মুড়ে একসাথে পথ চলা। যেমনটা বিষণ্ণতার ওপারে এক ফালি ভালোবাসাতে হচ্ছে। -আরিফুল
